জঙ্গল-পাহাড়-নদী-ঝর্ণার অপূর্ব সংমিশ্রণ সিমলিপাল সফর

পৃথ্বীশরাজ কুন্তী : ‘অফবিট’ — সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে এই শব্দটার সাথে আমরা প্রত্যেকেই কমবেশি পরিচিত। বরাবরই আমার অফবিট ট্যুর খুব প্রিয়। তাই বছরের শেষলগ্নে দু’দিনের জন্য সুযোগ মিলতেই বেরিয়ে পড়লাম। মনে সদ্য ঘুরে আসা মেঘালয়, মুর্শিদাবাদ, মায়াপুর, তারাপীঠ সফরের স্মৃতি। সেসব নিয়েই শীতের হাড়কাঁপানো ঠান্ডায় এক মধ্যরাতে বেরিয়ে পড়লাম। গন্তব্য সিমলিপাল — পাহাড়, জঙ্গল, নদী, ঝর্ণা সম্বলিত এক অপূর্ব প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যভূমি। শীতের নিস্তব্ধ রাতে বাগনান, খড়্গপুর, লোধাশুলি, গোপীবল্লভপুর হয়ে ছুটে চলল আমাদের গাড়ি। ভোরের আলো ফোটার আগেই পৌঁছে গেলাম ওডিশার অন্যতম মফস্বল বারিপদায়। বারিপদার হোটেল স্বাগতে ঘন্টা দু’য়েকের সাময়িক বিশ্রাম নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম সিমলিপালের জঙ্গল সাফারির উদ্দেশ্যে। বিস্তারিত জানতে নীচে পড়ুন…

সিমলিপালের জঙ্গলে বর্তমানে পর্যটকদের প্রবেশের জন্য দু’টি গেট রয়েছে। একটি পিথাবাটা, অপরটি যোশীপুর। পিথাবাটার কাছাকাছি শহর বলতে বারিপদা। বারিপদা থেকে পিথাবাটার দূরত্ব ১৬ কিমি। জঙ্গল সাফারির জন্য স্থানীয় বোলেরো গাড়ি রয়েছে। পাশাপাশি নিজের গাড়ি নিয়েও জঙ্গলে প্রবেশের অনুমতি মেলে। তবে অবশ্যই গাড়ি এসইউভি টাইপের হতে হবে। তবেই অনুমতি মিলবে। যাইহোক আমরা নিজেদের গাড়ি হোটেলে রেখে বারিপদা থেকে ভাড়া করা বোলেরোতে করেই পাড়ি দিলাম পিথাবাটার উদ্দেশ্যে। ঝাঁ চকচকে রাস্তা। দু’ধারে গাছের সারি। কখনো কখনো উঁকি মারছে উঁচু টিলা। এসব দেখতে দেখতে সকাল সাতটা নাগাদ পৌঁছে গেলাম পিথাবাটার গেটে।

জঙ্গলে প্রবেশের ছাড়পত্র পেতে নির্ধারিত সময় রয়েছে (সকাল ৬ টা-সকাল ৯ টা)। পিথাবাটার গেটে রয়েছে ওডিশা সরকারের বন দপ্তরের কার্যালয়। সেখানে গিয়ে নিজেদের সচিত্র পরিচয়পত্র দেখিয়ে জঙ্গলে প্রবেশের অনুমতি মিলল। প্রবেশমূল্য মাথাপিছু ১০০ টাকা। আর গাড়ির জন্য ১০০ টাকা। নিয়মানুযায়ী একটা গাইড নিতে হল। পিথাবাটা দিয়ে ঢুকে যোশীপুর দিয়ে বেরোনা যায়, আবার পিথাবাটা দিয়েও বেরোনা যায়। দু’টি ক্ষেত্রে গাইড চার্জ ভিন্ন। আমরা পিথাবাটা দিয়ে ঢুকে পিথাবাটা দিয়েই বেরোবো তাই গাইড চার্জ নিল ৩০০/- টাকা।

পাহাড়ের সাথে জলপ্রপাতের দৃশ্য অন্বেষণ করতে এবং তা লেন্সবন্দী করতে ছোট ট্রেকও করা যেতে পারে এই অঞ্চলে। তবে তার জন্য এখান থেকেই অনুমতি নিতে হবে। যাইহোক পারমিশন, টিকিট, গাইড নিতে, ছবি তুলতে প্রায় কেটে গেল ঘন্টাখানেক। সকাল আটটায় শুরু হল আমাদের সিমলিপাল সাফারি। জঙ্গলাকীর্ণ পথে লালমাটির উঁচুনিচু রাস্তা। একে একে পার করা হল তিনটি চেক পোস্ট। যেটা বোঝা গেল, বন বাঁচানোর লড়াইয়ে ওডিশা সরকার বেশ উদ্যোগী। জঙ্গলে যেকোনো অবাঞ্চিত বস্তু নিয়ে প্রবেশ রুখতেই মূলত এই চেকপোস্ট। তারপরই গভীর জঙ্গলে প্রবেশের পালা। ততক্ষণে ফোন থেকে উড়ে গেছে নেটওয়ার্ক। মনে তখন এক অন্য অনুভূতি। দৈনন্দিন জীবনের ব্যস্ততা থেকে অনেকটা দূরে প্রাকৃতিক পরিবেশ আর বৈচিত্র্যকে চাক্ষুষ করার পালা।

জঙ্গলের মধ্য দিয়েই কুলু কুলু শব্দে বয়ে চলেছে বুড়িবালাম, পলপলা, সাঁকো, খৈরি, সারান্ডি, থাকথাকি, ইস্ট ডেও, ওয়েস্ট ডে’র মতো কত জানা-অজানা নদী-নালা। এসব উপভোগ করতে করতেই এগিয়ে চলেছে আমাদের জঙ্গল সাফারির সারথি। ঘন জঙ্গলের মাঝে ড্রাইভার হঠাৎই গাড়ি থামিয়ে দিলেন। রাস্তার ঠিক পাশেই ঝোপের মধ্যে থাকা এক জোড়া হরিণকে দেখালেন। কিছুক্ষণ দেখার পরই আমাদের দেখে হরিণগুলি সেখান থেকে চলে গেল। যাইহোক আমরাও এগিয়ে চললাম। পথে মাঝেমধ্যেই দেখা মিলছে বানরের। সিমলিপালের জঙ্গলে রয়েছে হাতি, রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার, ভাল্লুক সহ অজস্র প্রাণী। জঙ্গলের কোর এরিয়ার মধ্য দিয়েই আমরা পৌঁছে গেলাম জোরান্ডা ওয়াটার ফলসে।

পাহাড়ের উপর থেকে নীচে নেমে আসছে সুবিশাল জলরাশি। জোরান্ডা ওয়াটার ফলসের উচ্চতা ৫৯৪ ফুট। এটি মূলত একটি সিঙ্গেল ড্রপ ঝর্ণা। জনমানবমহীন গহীন জঙ্গলে জোরান্ডা তার নিজ সৌন্দর্য নিয়ে দন্ডায়মান। গভীর জঙ্গলের মধ্যে বন দপ্তরের একটি কার্যালয় ব্যতীত জোরান্ডার আশেপাশে আর কিছুই নেই। এখানে একটি পর্যটক আবাস থাকলেও ২০০৯ সালে মাওবাদীরা তা উড়িয়ে দেয়। আসলে সিমলিপালের জঙ্গল একসময় মাওবাদীদের ডেরা ছিল। আজ সম্পূর্ণভাবে মুক্ত। এসব দেখতে দেখতে আবার লাল মাটির পথ বেয়ে জঙ্গল ছাড়িয়ে পাহাড়ি উপত্যকার উপর দিয়ে ছুটে চলল আমাদের গাড়ি। পথের পাশে ছোটো ছোটো দু-একটি আদিবাসী অধ্যুষিত গ্রাম। গ্রামের শিশুরা রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে হাত নাড়িয়ে সাদরে সম্ভাষণ জানাচ্ছে আমাদের। একটা গ্রামে গাড়ি থেকে নেমেই পড়লাম। গ্রামের শিশুদের দেখেই বোঝা যাচ্ছে অপুষ্টিজনিত সমস্যার শিকার তারা।

কথা বলে জানলাম, খাবার বলতে জমিতে ফলানো সামান্য ফসলই তাদের ভরসা। শিক্ষার আলো থেকেও তারা কার্যত বঞ্চিত। দু-একজন স্কুল গেলেও তা বহুদূরে৷ এসব জানতে জানতেই আবার এগিয়ে চলা। পথের ধারে শিশুরা আদা হাতে এগিয়ে আসছে। কাতর আবেদন জানাচ্ছে তাদের আদা কেনার জন্য। আমরাও তাদের আবেদন মেটাতে আদা নিয়ে চলেছি। আসলে ভ্রমণ মানে কেবল শুধু ঘুরে দেখা নয়, ভ্রমণ মানে পাশে থাকাও। পর্যটন একটা বৃহৎ শিল্প। সেই শিল্পের উপর অজস্র পরিবার নির্ভরশীল। মাহালিবাসা গ্রামে মানকিডিয়াদের বাস। তাদের জীবন এবং জীবিকা সম্পূর্ণভাবেই জঙ্গলের উপর নির্ভরশীল। সিমলিপালের জঙ্গলের অন্দরমহলে শিয়ালি তন্তু সংগ্রহ করেই দিন গুজরান হয়।

উল্লেখ্য, শিমলিপালের অন্যতম আকর্ষণ লাল রেশমের গাছ। শিয়ালি তন্তু দিয়ে তৈরি হয় দড়ি, ব্যাগ থেকে শুরু করে নানা উপকরণ। কয়েক শতাব্দী ধরে বনজ সম্পদের সংগ্রহ এবং বিক্রির উপরই জীবন নির্ভর করে এঁদের। এসব জানতে জানতেই লালমাটির ধুলো উড়িয়ে এগিয়ে চলল আমাদের গাড়ি। এবার গন্তব্য বড়হেপানি ঝর্ণা(৭১২ ফুট) — ভারতের অন্যতম উচ্চ ঝর্ণা। গভীর জঙ্গলের মধ্যে চঞ্চলা এই জলপ্রপাতের শব্দ দূর থেকেই শোনা যাচ্ছে। পাহাড়ের উপর থেকে গভীর খাতের দিকে নেমে আসছে সুবিশাল জলরাশি। এই জলপ্রপাত থেকেই সৃষ্টি হয়েছে বুধবালাঙ্গা নদীর। যা বাঙালির কাছে বুড়িবালাম নদী নামে পরিচিত। তবে বর্ষার সময় অতি বর্ষণের ফলে ভয়ঙ্কর রূপ নেয় এই জলপ্রপাত। দুপুর প্রায় অতিক্রান্ত। বেশ কিছুটা জঙ্গল পথ পেরোনোর পর পরল ছোট্ট একটি গ্রাম। গ্রামের মানুষ শালপাতার মধ্যে দেশি ও পোল্ট্রির মাংস পুড়িয়ে বিভিন্ন মশলা সহযোগে তা চিকেন কুড়া নামে খুব স্বল্প মূল্যের বিনিময়ে উপস্থাপন করছেন।

চিকেন কুড়ার স্বাদ গ্রহণ করে এগোনা গেল চাহালের পথে। পথে দু-এক জায়গায় হাড়িয়া, মহুয়া, মধু বিক্রি হচ্ছে। নাওনা ভ্যালির উপর দিয়ে ছুটে চলল গাড়ি। পাশেই পাহাড়। তারই পাশে সবুজ উপত্যকা। উপত্যকায় স্থানীয় মানুষ চাষাবাদ করেছেন। নাওনা ভ্যালির উপর দিয়ে আমরা পৌঁছে গেলাম চাহালের সল্টলেকে। জানা যায়, এটি ছিল ময়ূরভঞ্জের রাজার মৃগভূমি। এখানে তিনি শিকারে আসতেন। চাহালের সল্টলেকের প্রবেশপথে রয়েছে সুউচ্চ অজস্র ইউক্যালিপটাস গাছ যা এক গম্ভীর পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। এখানে রয়েছে বন দপ্তরের ওয়াচ-টাওয়ার। রয়েছে রাত্রিবাসের সুযোগ। পর্যটকরা চাইলে রাত্রিবাস করতে পারেন।

খুব সকালে কিমবা পড়ন্ত বিকালে এই সল্টলেকে বিভিন্ন পশুরা নুনের স্বাদ নিতে আসে। তাই কপাল ভালো থাকলে দেখা মিলতে পারে বিভিন্ন প্রাণীর। ওয়াচ-টাওয়ারে উঠে বেশ কয়েকটি হরিণের দেখা মিলল। তখন প্রায় সন্ধ্যা নামার পথে। ফিরতে হবে অনেকটা পথ। তাই আর দেরী না করে এবার ফেরার পালা। জঙ্গলাকীর্ণ পথে অন্ধকার নেমেছে। তার মাঝেই হেডলাইট জ্বেলে ছুটে চলেছে আমাদের গাড়ি। প্রায় দীর্ঘ সাড়ে এগারো ঘন্টার সাফারি শেষে সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা নাগাদ আমরা ফিরলাম আমাদের সেদিনের রাত্রিবাসের হোটেলে।

জঙ্গল, পাহাড়, নদী, ঝর্ণার এক অপরূপ সংমিশ্রণ সিমলিপাল। এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম বায়োস্ফিয়ার রিজার্ভ সিমলিপাল মানে এক বৈচিত্র্যভূমি। প্রাকৃতিক বৈচিত্র‍্যের পাশাপাশি এই ভূমিতে জড়িয়ে রয়েছে কতশত অজানা কাহিনী। সভ্যতার আলো থেকে অনেকটা দূরে থাকা এক সুবিশাল অঞ্চল। একদিনে বা একবারে সিমলিপালের এই বৃহৎ অঞ্চল ঘুরে দেখা কখনোই সম্ভব নয়। এখনো বাকি রইল লুলুং, সীতাকুণ্ড সহ সিমলিপালের অন্দরে ছড়িয়ে থাকা অজস্র অজানা জায়গা। তাইতো আবার সিমলিপাল আসার প্রবল ইচ্ছে নিয়ে এবারের সফর শেষ করলাম।

স্মর্তব্য:

১) জঙ্গল রক্ষা করা আমাদের সকলের আবশ্যক কর্তব্য। তাই প্লাস্টিক বা পলিথিন ব্যবহার না করাই শ্রেয়।

২) প্রায় দীর্ঘ বারো ঘন্টার লম্বা সাফারি। সাথে পর্যাপ্ত শুকনো খাবার ও পানীয় জল রাখা দরকার।

৩) নভেম্বর থেকে জুন অব্ধি সিমলিপাল পর্যটকদের জন্য খোলা থাকে। বাকি সময়ে খোলা থাকলেও ভারী বৃষ্টি হলে পর্যটকদের প্রবেশ বন্ধ থাকে।

৪) অবশ্যই নিজের সচিত্র পরিচয়পত্র রাখা দরকার।

Author: নিজস্ব সংবাদদাতা