সাইকেল নিয়ে দেশভ্রমণে শ্যামপুরের যুবক

বিশেষ প্রতিবেদক : কবি লিখেছিলেন,”থাকব না কো বদ্ধ ঘরে, দেখব এবার জগৎটাকে, কেমন করে ঘুরছে মানুষ যুগান্তরের ঘুর্ণিপাকে।” — আর পাঁচজন ছেলের মতোই সেও ছোটো বেলায় বিদ্রোহী কবির লেখা ‘সংকল্প’ কবিতার এই লাইনগুলো পড়েছিল। পাশাপাশি ছোটো থেকেই সাইকেল চালানোর প্রতি তার গভীর নেশা। সাথে প্রকৃতি ও পরিবেশের প্রতি এক অমোঘ আকর্ষণ। এসবের টানেই সাইকেল নিয়ে ভারতদর্শনে বেরিয়ে পড়েছেন গ্রামীণ হাওড়ার শ্যামপুরের কাঁঠিলাবারের বছর চব্বিশের যুবক অনিমেষ মাজি। বিস্তারিত জানতে নীচে পড়ুন…

২০২১ সালের অক্টোবর মাসে শ্যামপুর থেকে দেশভ্রমণের উদ্দেশ্যে সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়েছে অনিমেষ। তারপর ঝাড়খন্ড, ওডিশা, ছত্তিসগড়, অন্ধ্রপ্রদেশ, তেলেঙ্গানা, তামিলনাড়ু হয়ে সে পৌঁছে গেছে কেরলে। আপাতত কেরলের বিভিন্ন প্রান্ত ঘুরে দেখার পালা। তারপর আবার অন্য রাজ্যের উদ্দেশ্যে পাড়ি দেবে শ্যামপুরের এই একরত্তি যুবক। হঠাৎ সাইকেল নিয়ে ভারত দর্শনে কেন? — কেরলের মুন্নার থেকে প্রতিবেদককে অনিমেষ জানান, ভারতবর্ষের উত্তর থেকে দক্ষিণ, পূর্ব থেকে পশ্চিম বৈচিত্র‍্যে ভরপুর।

পাহাড়, পর্বত, মালভূমি, সমভূমি, জঙ্গল, সমুদ্র, ঝর্ণা নদী, ঐতিহ্য, সংস্কৃতির পীঠস্থান ভারতবর্ষ। দেশের সমস্ত রাজ্যকে ঘুরে দেখতে ও সাইকেলের মধ্য দিয়ে পরিবেশ বাঁচানোর আর্জি নিয়েই তাঁর বেরিয়ে পড়া। অনিমেষ জানিয়েছেন, প্রত্যেকদিন গড়ে প্রায় ১০০ কিমি সাইকেল চালাতে হয়। কখনও পাহাড়িপথের চড়াই – উৎরাই, আবার কখনো হাইওয়ে বা গ্রামের মেঠোপথ ধরে এগিয়ে চলা। সকাল সাড়ে আটটা-ন’টা নাগাদ শুরু হয় তার পথচলা। সারাদিন একের পর এক গ্রাম, মফস্বল পেরিয়ে সন্ধ্যা নামলে আশ্রয় নেন কোনো এলাকার মন্দিরে, বা মসজিদে আবার কোনোদিন সেটাও জোটেনা। তাই গাছের নীচেই টেন্ট ফেলে আশ্রয় নিতে হয়। রাতে একটু বিশ্রাম। তারপর সকালে উঠে একটু চা খেয়ে আবার বেরিয়ে পড়া। এই দীর্ঘ পথচলায় অজস্র ঘটনার সাক্ষী হয়েছে অনিমেষ।

তাঁর কথায়,”একদিন অন্ধ্রপ্রদেশের এক গ্রামে আছি। সন্ধ্যা নামায় আশ্রয় খুঁজছি। হঠাৎ এক ব্যক্তির সাথে দেখা। তিনি আমায় নিয়ে গেলেন গ্রামের মন্দিরে। সেখানে আমার রাত্রিবাসের ব্যবস্থা করলেন। সেখানে যেতেই স্থানীয় বাচ্চারা যেযার বাড়ি থেকে আমার জন্য বাড়ির খাবার এনে হাজির। পরেরদিন সকালে ওই স্থান ছাড়ব এমন সময় এক গৃহবধূ বাড়িতে ডেকে ভাত খাওয়ালেন।” এরকম বহু ভালোলাগার স্মৃতি ক্রমে স্থান নিচ্ছে তার অভিজ্ঞতার ঝুলিতে। এমনও হয়েছে সারাদিন জোটেনি খাবার।

কোনো কোনো দিন রাতে এমনও হয়েছে পথের ধারে যখন সে ঘুমিয়েছে তখন তার পাশে এসে শুয়েছে পথের কুকুররা। অনিমেষের এই সফরে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন বেশ কিছু মানুষ। সাইকেল দিয়ে পাশে দাঁড়িয়েছে এক সংস্থাও। ছোটোথেকেই পড়াশোনার প্রতি আগ্রহী অনিমেষ। পড়াশোনার পাশাপাশি লেখালিখিতেও বেশ পারদর্শী। অনিমেষের শ্যামপুরের বাড়িতে রয়েছেন মা, বাবা, বোন। দোকান চালিয়ে বাবা সংসার চালান। প্রত্যেকদিন সন্ধ্যা হলেই বেজে ওঠে বোনের ফোন। তবে ফোনে সবদিন নেটওয়ার্ক কিমবা চার্জ থাকে না। তবে সুযোগ পেলেই তার ভারত ভ্রমণের ছবি, ভিডিও আর অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেন সোশ্যাল মিডিয়ায়।

অনিমেষ জানান, আন্দামান বাদে আমি ভারতের প্রত্যেকটি রাজ্য ও সমস্ত কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল ঘুরে দেখব এই সফরে। পাশাপাশি, কোন অঞ্চলের কী দর্শনীয় স্থান আছে, কী প্রসিদ্ধ তা গুগল দেখে ও স্থানীয় মানুষের থেকে জানছি। সেগুলোও ঘুরে দেখছি। তবে তামিলনাড়ু, অন্ধ্রপ্রদেশ, কেরলের গ্রামে ভাষাগত সমস্যা হচ্ছে। সেক্ষেত্রে হিন্দি, ইংরেজির পাশাপাশি স্থানীয় মানুষকে আকারে, ইঙ্গিতেও বোঝানোর চেষ্টা করছেন সাইকেলপ্রেমী এই যুবক।

অনিমেষ জানায়, গুগল দেখে ও মানুষের সাথে কথা বলেই মূলত তিনি রুট নির্ধারণ করেন। পথে একাধিক বড়ো জঙ্গল পড়েছে। জঙ্গল অতিক্রম করতে কোনো সমস্যা না হলেও পাহাড়ে পথে উঠতে বেশ বেগ পেতে হয়। কিন্তু মনে তার অদম্য ইচ্ছে আর চোখে দেশ ভ্রমণের স্বপ্ন। অনিমেষ জানান, তার বাড়ি ফিরতে ফিরতে ২০২৩ সাল গড়িয়ে যাবে। সামনের দিনগুলিতে সে একে একে ঘুরে দেখবে গোয়া, মহারাষ্ট্র, রাজস্থান, কাশ্মীর, উত্তরাখন্ড, হিমাচলপ্রদেশ, দিল্লি, উত্তরপ্রদেশ, উত্তর – পূর্ব ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চল। সেই লক্ষ্যেই এগিয়ে চলেছে অনিমেষের রথ।

Author: নিজস্ব সংবাদদাতা