শরীরচর্চা ও পরিবেশরক্ষার বার্তা দিতে অভিনব উদ্যোগ ‘হাওড়া সাইকেল আরোহী’র

পৃথ্বীশরাজ কুন্তী : সালটা ১৮৮৬। সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়। বাইসাইকেলে চড়ে প্রথমবার বিশ্বভ্রমণে বেড়োনো টমাস ষ্টিভেন্সকে নিয়ে তিলোত্তমার বুকে তখন জমকালো আয়োজন। শহরজুড়ে বর্ণাঢ্য মিছিল। আর কোলকাতাবাসী তা বিস্ময়ে দেখতে থাকল। ১৮৮৬ থেকে ২০২০ — এর মাঝে গঙ্গা দিয়ে অনেক জল গড়িয়েছে, সেদিনের ইংরেজ সাহেবরা দেশ ছেড়েছে। কিন্তু, বাইসাইকেল বাংলা তথা বাঙালির অন্যতম বাহন হয়ে উঠেছে। যদিও, আজকাল যানজটের ভিড়ে তিলোত্তমার রাস্তায় সাইকেল ব্রাত্য। গলিতেও খুব একটা দেখা যায়না। কিন্তু, সাইকেল যে পরিবেশ আর শরীরের পক্ষে কতটা উপযোগী তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

সে-ই বার্তাই সমাজের দ্বারে পৌঁছে দিতে সুমন, রাকেশ, পিয়া, মৈনাকরা ছুটির দিনে সাইকেল নিয়ে বেড়িয়ে পড়েন। ভোরের আলো ফোটার আগেই সকলে সাইকেল নিয়ে হাওড়ার রামরাজাতলায় এসে মিলিত হন। তারপর কোনোদিন গন্তব্য হয় ব্যারাকপুর বর্তির বিল আবার কোনোদিন বা ময়দানের ভিক্টোরিয়া চত্বর কিমবা ডোমজুড়ের নোনাকুন্ডু। এভাবেই সাইকেলের প্যাডেলে পা রেখে ওরা কখনো ১০০ কিমি আবার কখনো ৬০ কিমি পথ পাড়ি দেয়। এরকমই কিছু স্বাস্থ্য ও পরিবেশ সচেতন যুবক-যুবতীকে নিয়ে গড়ে উঠেছে ‘হাওড়া সাইকেল আরোহী’।

সংগঠনটি সূত্রে জানা গেছে, তাদের তরফে প্রতি রবিবার একটি সাইকেল রাইডের ব্যবস্থা করা হয়। কখনো গন্তব্য হয় বিশ্ববাংলা গেট, কখনো বা ধবিঘাট। আর এই উদ্যোগে স্বতঃস্ফূর্তভাবে সামিল হয়েছেন হাওড়া শহরের বেশ কিছু তরুণ-তরুণী। প্রত্যেক সপ্তাহে ১২-১৩ জন আরোহী রাইডে অংশ নেন। গিয়ার দেওয়া অত্যাধুনিক সাইকেলের পাশাপাশি সাধারণ সাইকেলও থাকে। যাত্রাপথে একাধিক জায়গায় বিশ্রাম নিয়ে নির্ধারিত গন্তব্যস্থলে পৌঁছে যান আরোহীরা। তারপর আবার প্যাডেলে পা রেখে বাড়ি ফেরা।

সংগঠনের অন্যতম কর্তা তথা শিক্ষক রাকেশ দাস জানান, “ছোটো থেকে সাইকেল চড়ে বড়ো হয়েছি। কিন্তু, ব্যস্ত জীবনের মাঝে এখন আর সেভাবে চড়ার সুযোগ হয়না। সাইকেলিং একদিকে যেমন শরীরচর্চার পক্ষে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, তেমনই দূষণ রোধে অন্যতম হাতিয়ারও বটে। সাইকেল আমাদের কাছে এক নস্টালজিয়া। নবপ্রজন্মকে সাইকেল সম্পর্কে বার্তা দিতেই মূলত এই রাইড। প্রতি সপ্তাহে রাইড করতে গিয়েই সোশ্যাল মিডিয়ার দৌলতে ক্রমশ এর ব্যপ্তি বাড়ছে। অভিযানে অংশ নিচ্ছেন অনেক পড়ুয়াও। তাদের সকলকে একত্রিত করেই এই সংগঠন গড়ে তোলা।”

রাকেশ বাবু জানান, মূলত রবিবার ও অন্যান্য ছুটির দিনকেই তাঁরা রাইডের দিন হিসাবে বেছে নেন। ইতিমধ্যেই তাঁরা ব্যারাকপুর, বিশ্ববাংলা গেট, ধবীঘাট সহ একাধিক জায়গায় সাইকেল নিয়ে ঘুরে ফেলেছেন। কোনোটায় সময় লাগে ২ ঘন্টা, কোনোটায় আবার ৮ ঘন্টা। পথেই সকলে একসাথে প্রাতরাশ সারেন। সংস্থাটির আরেক সদস্য সুমন রায় বলেন, “আমাদের রাইডের ক্ষেত্রে মানুষ সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন। যেমন গত কয়েকদিন আগেই ধবিঘাট যেতে গিয়ে সালকিয়ার কাছে সাইকেল খারাপ হয়ে গিয়েছিল। খুব সকালে দোকান খুলে সাইকেল সারিয়ে দিয়েছেন এক মিস্ত্রী।” এবার সাইকেল নিয়েই গড়চুমুক, দীঘা যাওয়ার পরিকল্পনা চলছে ‘হাওড়া সাইকেল আরোহী’র অন্দরে। আর সেই অভিযানের জন্যই মুখিয়ে রয়েছেন সুদীপ্ত, সোমনাথ, কবিতারা।

Author: নিজস্ব সংবাদদাতা