দেওয়া হত নরবলি! ঝাড়গ্রামের জাগ্রত দেবী কনকদুর্গার জানা-অজানা কাহিনী

পৃথ্বীশরাজ কুন্তী : বাংলার পর্যটন মানচিত্রে ক্রমশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে ঝাড়গ্রাম। প্রকৃতির মোহময়ী রূপের পাশাপাশি ঝাড়গ্রামের পর্যটনের অন্যতম আকর্ষণ যে দেবী কনকদুর্গা তা নির্দ্বিধায় বলাই যায়। কনকদুর্গা কেবল জাগ্রত দেবীই নন, বহু ইতিহাস-ঐতিহ্য-সংস্কৃতির অন্যতম প্রতীক। কনকদুর্গাকে কেন্দ্র করে প্রচলিত রয়েছে বহু মিথ। স্থানীয় এলাকায় কানপাতলেই তা কমবেশি আভাস পাওয়া যায়। আর এসব শোনার পরই মনে কনকদুর্গা মন্দির দর্শনের ইচ্ছে জেগেছিল। তাই বেলপাহাড়ি যাবার পথে চিল্কিগড়ের কনকদুর্গা মন্দির দেখে নিলাম।

লোধাশুলির দিক থেকে ঝাড়গ্রাম শহরে প্রবেশের কিছুটা আগেই দুবরাজপুর মোড়। মোড় থেকে বামদিকে চলে গিয়েছে গিধনি রোড। দু’পাশের শাল-মহুয়ার জঙ্গল, নীরব পরিবেশকে সাথে নিয়ে গিধনি রোড ধরে কিছুটা এগিয়ে গেলেই ডানদিকে কনকদূর্গা মন্দিরের প্রবেশপথ। তবে মন্দিরের প্রবেশদ্বার থেকে গর্ভগৃহের দূরত্বটা প্রায় ৫০০ মিটার। স্বল্পমূল্যে টিকিট কেটে কনক অরণ্যের ছায়াঘন, রোমাঞ্চকর জঙ্গলপথ দিয়ে এগিয়ে চলা। দু’পাশের জঙ্গল, আর গা ছমছম করা নিস্তব্ধতা। তার মাঝেই দেবীদর্শনের লক্ষ্যে এগিয়ে চলা। প্রায় ৬৩ একর ঘন জঙ্গলের মধ্যে রয়েছে কয়েকশো প্রজাতির বৃক্ষ ও লতাগুল্ম। রয়েছে বহু মূল্যবান প্রজাতির ঔষধি গাছ। কনক অরণ্য যে প্রাকৃতিক জীববৈচিত্র‍্যের বিপুল সম্ভার তা বলাই যায়।

এসব দেখতে দেখতেই মন্দির চত্বরে হাজির হয়ে যাওয়া। নতুন মন্দিরের গর্ভগৃহে অষ্টধাতুর তৈরি চতুর্ভুজা-ত্রিনয়নী কনকদুর্গা নিজ মহিমায় বিরাজমান। মন্দিরের পাশ দিয়েই ছান্দিক গতিতে কুলু কুলু শব্দে বয়ে চলেছে পাহাড়ি নদী ডুলুং। মন্দির চত্বরে বানরদের উপস্থিতি বেশ চোখে পড়ার মতো। বর্তমান মন্দিরের পাশে কালের সাক্ষী হয়ে ভগ্নপ্রায় দশায় অবস্থান করছে পোড়ামাটির তৈরি সুপ্রাচীন প্রাচীন মন্দিরটি। মন্দিরের কারুকার্যসমন্বিত দেওয়াল ভেদ করে মাথা তুলেছে বট-অশ্বত্থ। ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, প্রায় সাড়ে পাঁচশো বছর পূর্বে চিল্কিগড়ের ব্রাহ্মণ রাজা বিশ্বরূপ ত্রিপাঠীর আমলে মন্দিরটি তৈরি হয়। ত্রিপাঠী বিষ্ণুর উপাসক ছিলেন। তাই এই মন্দির নির্মাণ করা হয় বলে মনে করা হয়।

পোড়া ইট, পোড়া টালি, চুন-সুরকি দিয়ে তৈরি এই সুপ্রাচীন মন্দিরের দেয়াল জুড়ে অজস্র শিল্পকর্মের নিদর্শন। মন্দিরটিতে উড়িষ্যার সাথে উত্তর ভারতের শৈলীর সংমিশ্রণ রয়েছে বলে মনে করা হয়। বিশিষ্ট গবেষক মৃণালকান্তি শতপথী তাঁর ‘দেবী কনকদুর্গা: ইতিহাস ও লোকবিশ্বাস’ শীর্ষক বইয়ে লিখেছেন, আনুমানিক ১৪৭৫ খ্রিস্টাব্দে এই মন্দিরটি তৈরি হয়েছিল। যদিও কালের নিয়মে সুপ্রাচীন মন্দির আজ জীর্ণ। জানা যায়, চিল্কিগড়ের সামন্তরাজা গোপীনাথ মত্তগজ সিংহ একরাতে দেবী মহামায়ার স্বপ্নাদেশ পান। সেই রাতেই আরও দু’জন ব্যক্তি দেবীর স্বপ্নাদেশ পান। দু’জনের মধ্যে একজন শিল্পী যোগেন্দ্রনাথ কামিল্যা ও অপরজন ব্রাহ্মণ রামচন্দ্র ষড়ঙ্গী। দেবীর স্বপ্নাদেশ পেয়েই রাজা গোপীনাথ ১৭৪৯ সালে (১১৫৬ বঙ্গাব্দ) কনকদুর্গার বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করেন। আশ্বিন মাসের শুক্লা সপ্তমী তিথিতে দেবীর প্রতিষ্ঠা হয়েছিল৷

পুরনো মন্দিরটি ‘বড়োমহল’ নামে পরিচিতি লাভ করে। শোনা যায়, পরবর্তী সময়ে কমলাকান্ত নামক এক রাজা মন্দির স্থানান্তরে উদ্যোগী হলে নীল শাড়ি পরিহিতা কনক দেবী তাঁকে মন্দির না সরানোর স্বপ্নাদেশ দেন। জানা যায়, সেদিনের পর থেকে রাজ পরিবারের কোনো সদস্যা নীল শাড়ি পড়েননা বলে শোনা যায়। পুরোনো মন্দিরটি জীর্ণ হয়ে পড়লে ১৯৩৭ সালে সেই জায়গায় বর্তমান মন্দিরটি তৈরি হয়। তবে দেবী একই জায়গায় অধিষ্ঠিত আছেন। চিল্কিগড়ের রাজাদের কুলদেবী শুধু ঝাড়গ্রাম নয়, পশ্চিমাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকার মানুষের কাছে অত্যন্ত জাগ্রত দেবী হিসাবে পরিগণিত হন।

জনশ্রুতি, এলাকাটি একসময় খরাপ্রবণ ছিল। এর জেরে দীর্ঘদিন বহু মানুষের কার্যত অনাহারে দিন কাটছিল। হঠাৎই এক অলৌকিক ঘটনার সাক্ষী থাকল মানুষ—হঠাৎ আকাশ জুড়ে মেঘের উপস্থিতি ও ভারী বর্ষণ। বৃষ্টিতে কোনো প্রাণহানি তো হলই না, উপরন্তু আবার মাঠ শস্যশ্যামলা হয়ে উঠল। এক প্রবীণ ব্যক্তি এই সমগ্র ঘটনাটিকে দেবী মহামায়ার আশীর্বাদ বলে বর্ণনা করলেন। তারপরই বটগাছের তলায় ছোটো মন্দির নির্মাণ করে শুরু হল মাতৃ আরাধনা। এরকমই একাধিক মিথ প্রচলিত আছে। শোনা যায়, গভীর রাতে পুজো শেষ করে এই গভীর অরণ্য দিয়ে একা একা বাড়ি ফিরতে ভয় পেতেন পুরোহিত। দেবী এক্ষেত্রেও ত্রাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে অভয় দান করেছিলেন। তবে শর্ত ছিল একটাই, যাত্রাপথে পিছনে ফিরে তাকানো যাবেনা। পুরোহিত রাতের পর রাত ভয়হীনভাবে গভীর জঙ্গলপথে যাতায়াত করতেন।

এভাবেই দেবীর মহিমার কথা দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। আর এভাবেই দেবী কনকদুর্গার প্রতি মানুষের বিশ্বাস বাড়তে থাকে। মন্দিরের সামনেই আটচালায় রয়েছে বলিকাঠ। কথিত আছে, একসময় জঙ্গলে অষ্টমীর গভীর রাতে নরবলি হত। যদিও ব্রাহ্মণ সন্তান কিমবা প্রজাদের মধ্যে কাউকে বলি দেওয়া হত না। বলির ‘পাত্র’ নিজেই নাকি চিল্কিগড়ের গভীর জঙ্গলে অষ্টমীর রাতে এসে হাজির হতেন। বলি দিয়ে ধড় ও নরমুন্ড জঙ্গলে একটি পাতাল কুয়োয় ফেলে দেওয়া হত। একবার নাকি কোনোকারণে এক ব্রাহ্মণ সন্তান নরবলির জন্য এসে হাজির হয়েছিলেন। সেই থেকেই চিরতরে এই প্রথা বন্ধ হয়ে যায়।

তবে এখনও পুজোয় ছাগবলির রীতি প্রচলিত আছে। অষ্টমীর নিশা পুজোয় অংশ নেন শুধুমাত্র রাজপরিবারের সদস্যরাই। মানুষের বিশ্বাস, নবমীর ভোগ রান্না করেন স্বয়ং দেবী। অষ্টমীর রাতে পাঁঠা বলি দিয়ে সেই মাংসে নুন-মশলা-গাওয়া ঘি মাখিয়ে একটি বিশালাকার নতুন মাটির হাঁড়িতে ভরে তার মুখ বেঁধে দেন পুরোহিত৷ হাঁড়ির গায়ে মন্ত্র লিখে ভোগ রান্নার ঘরে কাঠ-কয়লার আঁচে চাপিয়ে দেন তিনি৷ পিতলের খুন্তি হাঁড়ির উপর আড়াআড়ি রেখে বীজমন্ত্র জপে পুরোহিত সেই ঘরের দরজায় তালা লাগিয়ে দেন৷ নবমী তিথিতে ঘরের তালা খুলে সেই ভোগ বিতরণ করা হয়৷ এটি ‘বিরাম ভোগ’ নামে পরিচিত। রাজা গোপীনাথ সিংহের পাটরানি গোবিন্দমনির হাত ধরে এখানে বিরাম ভোগ চালু হয়েছিল বলে জানা যায়।

কালের নিয়মে বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে গিয়েছে রাজতন্ত্র কিমবা রাজা। কিন্তু চিল্কিগড়ের কনকদুর্গা মন্দির প্রাচীন ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির এক মিলনক্ষেত্র হিসাবে তার সুনাম আজও অক্ষুন্ন রেখেছে। আর এভাবেই শত শত বছর ধরে বেঁচে সজীব থাকুক বাংলার ঐতিহ্যবাহী লোক-সংস্কৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্য।

Author: নিজস্ব সংবাদদাতা