গ্রুপ অফ টেন কী ও কেন?

– শ্রী দেবাশিস চৌধুরী

বিধাতা-পুরুষের খেয়াল বড়ই অদ্ভূত। তাঁর ইচ্ছেয় কেন জানিনা এই বিশ্বের বড় বড় ঘটনার সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের, বিশেষত খনিজ তেলের যোগসূত্র থাকাটা যেন বাধ্যতামূলক হয়ে গেছে। যেমন ১৯৪৮ সালের ১৪ই মে ইসরাইল রাষ্ট্রের জন্ম আর তারপর থেকেই বারবার মধ্যপ্রাচ্যে আরব-ইসরাইল সঙ্ঘাত নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তেমনই ১৯৬০ সালের ১৪ই সেপ্টেম্বর ‘ওপেক’ (Organization of Petroleum Exporting Countries) – এর জন্মই হয়েছিল পশ্চিমী দুনিয়ার প্রথম বিশ্বের দেশগুলির সঙ্গে স্বার্থের সঙ্ঘাত থেকে। ওপেকের সূচনালগ্নে পাঁচটি তেল রপ্তানীকারী রাষ্ট্র ছিল। প্রতিষ্ঠাতা দেশগুলি ইরান, ইরাক, কুয়েত, সৌদি-আরব ও ভেনেজুয়েলা। পরে বিভিন্ন সময়ে ইন্দোনেশিয়া, নাইজেরিয়া সহ আরও আটটি দেশ যোগ দেয়। এখন মোট ১৩টি তেল রপ্তানীকারক রাষ্ট্র নিয়ে ওপেকের পরিবার।

১৯৬৭ সালে ছয় দিনের আরব-ইসরাইল যুদ্ধের পর বাড়তে থাকা আরব দেশগুলির অসন্তোষ আরও বৃদ্ধি পায় ১৯৭৩ সালে রমজান যুদ্ধ বা ইয়োম কিপুর যুদ্ধের পর থেকে। ওই যুদ্ধের সময় ইসরাইলকে সমর্থন করার কারনে ওপেকভুক্ত আরব দেশগুলি প্রথম বিশ্বের দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, পশ্চিম ইউরোপ এবং জাপানে তেল রপ্তানীর উপরে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এই আরোপিত নিষেধাজ্ঞার ফলে উদ্ভূত তেল সংকটকে কেন্দ্র করে তৎকালীন মার্কিন অর্থমন্ত্রী জর্জ পি. শুল্টজ এর নেতৃত্বে আমেরিকা, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স ও পশ্চিম জার্মানির অর্থমন্ত্রীদের নিয়ে হোয়াইট হাউসের লাইব্রেরী রুমেএকটি বৈঠক হয়। ওই বৈঠকে যোগদানকারী দেশগুলিকে একত্রে চিহ্নিত করা হয় ‘লাইব্রেরী গ্রুপ’ নামে। সেদিনের লাইব্রেরী গ্রুপকেই আজকের ‘গ্রুপ অফ সেভেন’ বা জি-৭ এর উৎস বলে ধরা হয়।

ফ্রান্সের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ভ্যালেরি জিস্কার্ডের উদ্যোগে ১৯৭৫ সালে চারটি লাইব্রেরী গ্রুপের সদস্য এবং ইতালি ও জাপানকে নিয়ে ‘গ্রুপ অফ সিক্স’ তৈরী করা হয়েছিল। জি-৬’এ ১৯৭৬ সালে কানাডা যোগ দিলে তা ‘গ্রুপ অফ সেভেন’ নামে পরিচিতি পায়। পরবর্তীকালে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার ও মার্কিন রাষ্ট্রপতি বিল ক্লিনটনের আমন্ত্রণে ১৯৯৭ সালে রাশিয়া জি-৭’এ যোগ দিলে তা ‘গ্রুপ অফ এইট’ রূপে পরিচিত হয়। কিন্তু ২০১৪ সালে রাশিয়া ক্রিমিয়া দখল করে নিলে পশ্চিমী দেশগুলি রাশিয়ার বিরুদ্ধে একযোগে প্রতিবাদ জানাতে শুরু করে আর সেই বছরই রাশিয়াকে জি-৮ থেকে খারিজ করে দেওয়া হয়, ফলে জি-৮ হয়ে যায় জি-৭। তবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন এখন জি-৭’এ প্রতিনিধিত্ব করলেও সদস্যরূপে গণ্য হয় না। বর্তমানে আন্তর্জাতিক অর্থ ভান্ডার (IMF) এই জি-৭ কেই বিশ্বের মূল উন্নত-অর্থনীতির দেশ হিসাবে স্বীকৃতি দেয়, কারন জি-৭ বিশ্ব-সম্পদের প্রায় ৬৫ ভাগের অধিকারী।

পরবর্তীকালে ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডের আগ্রহে ব্রাজিল, চিন, ভারত, মেক্সিকো ও দক্ষিণ আফ্রিকা এই মোট পাঁচটি উন্নয়নশীল দেশ “আউটরিচ ফাইভ” বা “প্লাস ফাইভ” নামে জি-৭ এ অন্তর্ভুক্ত হয় এবং জি-৭ এর সম্মেলনে নিয়মিত অংশগ্রহণ করতে থাকে, যাকে সাধারণত জি-৭+৫ সম্মেলন বলা হয়। এই সম্মেলনে আলোচনার বিষয়গুলির মধ্যে স্বাস্থ্য, আইনের প্রয়োগ, শ্রম, অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন, জ্বালানী, পরিবেশ, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, বিচারব্যবস্থা, সন্ত্রাস ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য অন্যতম।

সম্প্রতি মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প আমন্ত্রণ জানিয়েছেন আরও তিনটি দেশকে এই জি-৭ গ্রুপে সরাসরি অন্তর্ভুক্ত হওয়ার জন্য। দেশগুলি হলো রাশিয়া, ভারত ও অস্ট্রেলিয়া। এই দেশগুলি যদি জি-৭ এর সম্মেলনে যোগ দেয়, ‘গ্রুপ অফ সেভেন’ এর নতুন নামকরণ হবে ‘গ্রুপ অফ টেন’ বা জি-১০। এখন প্রশ্ন, প্রথম বিশ্বের ওই দেশগুলির সাথে তৃতীয় বিশ্বের দেশ ভারত কে এক আসনে বসানোর জন্য এই আগ্রহের কারন কি? রাশিয়া আগে জি-৮ এর সদস্য থাকায় এখন নতুন করে তার অন্তর্ভুক্তি বিস্ময়কর নয়। অপরদিকে অস্ট্রেলিয়াকে বর্তমানে প্রথম বিশ্বের দেশ হিসাবে যেহেতু দেখা হয় তাই তার যোগদানও অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু বিস্ময় জাগায় প্লাস ফাইভের অন্তর্ভুক্ত তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নশীল একটি দেশ ভারতের অন্তর্ভুক্তি নিয়ে। প্রশ্ন উঠছে, তবে কি আগামীদিনে জি-১০ একটি সামরিক জোট হিসাবে আত্মপ্রকাশ করতে চলেছে?

করোনা সঙ্কটকালে আমেরিকা ও ইউরোপসহ গোটা বিশ্বের প্রায় সমস্ত দেশই চিন কে আজ যখন দোষী মানছে, চিন করোনা থেকে বিশ্বের দৃষ্টি ঘোরাতে কতিপয় পদক্ষেপ নিয়েছে। একদিকে দক্ষিণ চিন সাগরে তার সামরিক উপস্থিতি অস্বাভাবিক রকমের বাড়িয়ে দিয়ে তাইওয়ান, ভিয়েতনাম, জাপান এমনকি অস্ট্রেলিয়াকেও ভীতসন্ত্রস্ত করতে চাইছে। অপরদিকে পূর্ব-লাদাখে ভারতীয় সীমান্তে (LAC) সামরিক তৎপরতা বৃদ্ধি করে যুদ্ধের পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। আবার সম্প্রতি আমেরিকায় জর্জ ফ্লয়েডের মৃত্যুর ঘটনাকে ঘিরে বিক্ষোভ প্রদর্শন ক্রমশ সরকার বিরোধী হিংসাত্মক দাঙ্গায় পরিণত হচ্ছে তার পিছনে আন্তর্জাতিক মহল পরোক্ষে চিনের হাত দেখতে পাচ্ছেন।

চিন এই সব কিছু করছে শুধুমাত্র অর্থনৈতিক পরিকাঠামো ধরে রাখতে। করোনা-কান্ডের জেরে বিদেশী কোম্পানীগুলি যখন একে একে চিন থেকে নিজেদের ব্যবসা গুটিয়ে ভারতে চলে আসতে চাইছে, লক্ষণীয় বিষয় ঠিক তখনই চিন যুদ্ধ-পরিস্থিতি তৈরী করে ওই কোম্পানীগুলিকে বার্তা দিতে চাইছে ভারত তাদের পক্ষে নিরাপদ গন্তব্য হতে পারে না। আসলে স্বদেশী হোক বা বিদেশী, কোনো কোম্পানীর পক্ষেই অস্থির পরিবেশে ব্যবসা করা সম্ভব নয়। সুতরাং ভারতের মাটিতে যদি যুদ্ধ-পরিস্থিতি তৈরী করে দেওয়া যায় তাহলে ওই কোম্পানীগুলি চিন ছাড়ার আগে দু’বার ভাববে। ঠিক যেমন বালাকোট এয়ার স্ট্রাইকের পর গিলগিট-বালটিস্তান এলাকায় কারাকোরাম-হাইওয়ে প্রজেক্টে কর্মরত চিনা-কোম্পানী তাদের লোকজনদের সরিয়ে দিয়ে সাময়িকভাবে কিছুদিনের জন্য প্রজেক্টটি বন্ধ রেখেছিল।

এই পরিস্থিতে যদি ভারত জি-১০’এ অন্তর্ভুক্ত হয় সেটা চিনের পক্ষে বহুমুখী বিপদ ডেকে আনবে। প্রথমত চিন ছাড়তে চাওয়া কোম্পানীগুলি ভারতে আসার ক্ষেত্রে আরও সদর্থক চিন্তা-ভাবনা নেবে, ফলে ভবিষ্যতে ভারতের GDP যেমন বাড়বে অপরদিকে চিনের GDP কমতে বাধ্য। দ্বিতীয়ত চিনের GDP কমতে থাকলে স্বভাবতই চিনা-নাগরিকদের মধ্যে শি জিনপিং নেতৃত্বাধীন কমিউনিস্ট সরকার ও পার্টির প্রতি নানা বিষয় নিয়ে ক্রমবর্দ্ধমান ক্ষোভে তা ঘি ঢালবে এবং ভবিষ্যতে হয়তো চিনের বুকে ১৯৮৯ সালের তিয়েনআনমেন স্কোয়ারের আন্দোলনের থেকেও বড় আন্দোলনের জন্ম দিয়ে কমিউনিস্ট শাসনের পতন ডেকে আনতে পারে। তাই যখন থেকে ভারতের নাম উঠেছে, চিন লাগাতার হুমকি দিতে শুরু করেছে।

অভিজ্ঞ মহলের মতে ভারতকে জি-১০’এ নিয়ে আসার বড় কারন হচ্ছে মুখ্যত রাজনৈতিক, প্রথম বিশ্বের দেশগুলি কে যদি চিনের সঙ্গে সন্মুখ সমরে একান্তই যেতে হয় তবে দুটি কাজ তাদের আগে করতে হবে। প্রথমত রাশিয়াকে চিন-প্রশ্নে নিজেদের অক্ষে না পেলেও অন্তত নিরপেক্ষ রাখতেই হবে। দ্বিতীয়ত ভারতকে পাশে পেতেই হবে কারন চিনের দক্ষিণ-পশ্চিম অংশে প্রবেশ করতে হলে ভারতের দিক দিয়ে আসাটাই সামরিক দিক থেকে সুবিধাজনক। নেপাল ও ভূটান চিনের সীমান্তে হলেও তিনদিক ভারতের সঙ্গে যুক্ত। আবার মায়ানমার ও ভিয়েতনামের অবস্থান সুবিধাজনক হলেও দেশ দুটির ‘ফিল্ড-ডেপ্থ’ কম হওয়ায় সামরিক গুরুত্ব ভারতের তুলনায় কম।

স্বভাবতই প্রশ্ন উঠবে এতে ভারতের লাভ কোথায়? মাথায় রাখতে হবে যেকোন যুদ্ধের পিছনে থাকে অপর দেশের  সামরিক দিক থেকে সুবিধাজনক ভৌগলিক অঞ্চল নিজের দখলে আনা এবং অর্থনৈতিক স্বার্থের অঙ্কে প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর অঞ্চলে নিজের প্রভাব বিস্তার করা। যার উদাহরণ চিনের তিব্বত দখল করার মধ্যে স্পষ্ট বোঝা যায়। শুধু একবার তিব্বতের মানচিত্রে চোখ বুলিয়ে দেখুন কটা নদ-নদীর উৎসভূমি এই অঞ্চল। ১৯৫০ সালে চিনের তিব্বত আক্রমণের সময় তৎকালীন ভারতের প্রধানমন্ত্রী জহরলাল নেহেরু যদি সেইদিন ভারতীয় সৈন্যবাহিনীকে তিব্বত রক্ষায় পাঠাতেন হয়তো ১৯৬২র যুদ্ধ ভারতকে দেখতেই হতো না। নেপালের পূর্ব সীমান্তে তখন চিন নয় তিব্বত থাকতো ফলে চিনের উসকানিতে নেপালের আজকের এই ভারত বিরোধী মনোভাবের জন্মই হতো না। আজ আবারও সুযোগ এসেছে, এখন দেখার বিষয় দিল্লী-সরকার এই সুযোগ কাজে লাগায় কিনা।

Author: নিজস্ব সংবাদদাতা