মাত্র ৩৫ পয়সাতেই রাজপুরের চন্ডী বাড়িতে পূজিতা হন মা বিপত্তারিণী

নিজস্ব সংবাদদাতা : দক্ষিণ ২৪ পরগণা জেলার রাজপুর অঞ্চল। আজ বেশ শহরতলির রূপ ধারণ করলেও বেশ কয়েক দশক আগে অব্ধি গ্রামই ছিল সোনারপুর সংলগ্ন এই অঞ্চল। জানা যায়, রাজপুর গ্রামে অধিকাংশ বর্ধিষ্ণু ব্রাহ্মণ পরিবারের বসবাস। তারমধ্যেই বেশ কিছু সম্ভ্রান্ত মাহিষ্য পরিবারও বাস করত কোলকাতা লাগোয়া এই গ্রামে। এমনই এক মাহিষ্য পরিবারের জ্যেষ্ঠপুত্র দুলাল দাশ। দুলাল বাবুর বাবা সাধন চন্দ্র দাশ, মা বসন্ত কুমারী দেবী। কথিত আছে, জগন্মাতা দক্ষিণা কালিকা নতুন রূপে নতুন কলেবরে আবির্ভূতা হন এই দুলালের সামনেই। শিবোপরি দিগম্বরী করালবদনা মুণ্ডমালিনী আজ হলেন সিংহবাহিনী মহাশূল ধারিণী। নাম তাঁর বিপত্তারিণী চণ্ডী। আর গরীবের ঘরে তিনি পূজা নেন ৩৫ পয়সাতেই।

লোককথা অনুযায়ী, একদিন বালক দুলাল বসে আছেন নিজের ঘরে চৌকিতে তখন মা আলোকিত করে এলেন তাঁর কাছে। তিনি আনন্দিত হয়ে প্রণাম করলেন দেবীকে আর তখন বালিকারূপিণী চণ্ডীমাতা তাঁকে বিপত্তারিণীর ব্রতের কথা বলতে লাগলেন, “আষাঢ়স্য শুক্লপক্ষে দ্বিতীয়ার পর এই ব্রত আচরিবে দশমী ভিতর। পূর্বদিনে নিরামিশ্য খাবে একবার, এই ব্রত করিবে শুধু মঙ্গলবার। ত্রয়োদশ গ্রন্থিযুক্ত রক্তবর্ণ ডোরে – নরনারী সবে ধর দক্ষিণ করে।” এছাড়াও তিনি আরও বললেন, “তেরো রকমের ফল আমার ষোড়শোপচারে দেবে। ষোলো আনার পরিবর্তে ষোল পয়সা নেবে। ডোরের নিমিত্ত চার পয়সা আর দক্ষিণা বাবদ চার পয়সা। দক্ষিণা ছাড়া ব্রতীর ব্রত পূর্ণ হয় না, তাই দক্ষিণা গ্রহন করো। গরীবের জন্যই আমি এসেছি, তারা সহজসাধ্য মতো তাহাদের মনোস্কামনা পূরণের জন্যই আমার এই আদেশ।” এইভাবেই চণ্ডীমাতা জানিয়ে গেলেন বিপত্তারিণী ব্রতের রীতিনীতি। বালক দুলাল সমস্ত কথা ভক্তদের বলে দিলেন যা তাঁকে স্বয়ং মা বলেছেন।

বাংলার ১৩৩৪ সালে বিপত্তারিণী চণ্ডীব্রতের সূচনা ঘটে এবং তা আজও প্রচলিত এই চণ্ডী বাড়িতে। বর্তমানে মাত্র ৩৫ পয়সায় ব্রতাদি সম্পন্ন হয়। প্রচলিত বিধিমতে শ্রীশ্রী বিপত্তারিনী দুর্গাব্রতের কথা উল্লেখ পাওয়া যায় কিন্তু শ্রীশ্রী বিপত্তারিনী চণ্ডীব্রতের উল্লেখ নেই। এইরূপে অপ্রচলিত বিপত্তারিণী চণ্ডীব্রত পণ্ডিতমহলকে বিচলিত করে কিন্তু বালক দুলাল তাতে বিন্দুমাত্র বিচলত ছিলেন না, কারণ দেবী তাঁকে স্বয়ং নিজে বলেছেন ব্রতের সমস্ত নিয়ম। কড়াপাক সন্দেশ বালক দুলালের প্রিয় আর চণ্ডীমাতার প্রিয় কাঁচাগোল্লা। লোকগাথা অনুযায়ী, জগতে যখনই অশুভ শক্তির প্রভাব বেড়েছে সেই অশুভকে নাশ করতে মা ধরাধামে অবতীর্ণা হলেন বিপত্তারিণী চণ্ডী নামে। দুলালের গৃহে মা বিরাজ করলেন ভক্তদের মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করতে। আজ রাজপুরের চণ্ডী বাড়ি বঙ্গের প্রাচীন মন্দিরের এক অন্যতম মন্দির। বহু ভক্তের কাছে আজ এক তীর্থস্থান এই বিপত্তারিণী বাড়ি। মায়ের বিগ্রহ ছাড়াও রয়েছে দেবী দুর্গার বিগ্রহ, রয়েছে বিভিন্ন দেবদেবীর বিগ্রহ, রয়েছে সাধক দুলাল বাবার মূর্তি, এবং তাঁর ব্যবহৃত জিনিসের সংগ্রহশালা। রয়েছে রত্নবেদী এবং ভক্তদের পূজা দেবার জন্য সমস্ত ধরনের উপকরণের দোকান। উল্লেখ্য, বিপত্তারিণী ব্রতের দিন বহু ভক্তের সমাগম ঘটে এই চণ্ডীবাড়িতে।

Author: নিজস্ব সংবাদদাতা